প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে
ভেসে থাকা খুবই ছোট একটি দেশ নাউরু। মাত্র ২১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা এই দেশটি
ভ্যাটিকান সিটি এবং মোনাকোর পর বিশ্বের ৩য় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। এর জনসংখ্যাও বেশ সীমিত।
মাত্র ১২ হাজার আদিবাসী নিয়ে চলছে এই দেশটি। চলছে বলা সহজ হলেও, বাস্তব দৃশ্য পুরোপুরি
ভিন্ন। বর্তমানে নাউরুর না আছে কোনো আবাদি জমি, না আছে এখানকার জনগণের কোনো নিশ্চিন্ত
জীবন। মাত্র দুই দশকেই বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র থেকে ভাড়াটে রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে
নাউরু। যেই নাউরুকে একসময় প্রশান্ত মহাসাগরের কুয়েত বলা হতো, সেই নাউরু কিনা এখন অন্য
রাষ্ট্রের কাছে হাত পেতে চলে। কীভাবে এলো বিশাল অধঃপতন? চলুন জেনে নেওয়া যাক সে কথা।
পৃথিবীর তৃতীয় ক্ষুদ্রতম
রাষ্ট্র নাউরু। আয়তন ২১ বর্গ কিলোমিটার (৮.১ বর্গ মাইল)। জনসংখ্যা প্রায় ১২ হাজার।
আসলে নাউরু একটা দ্বীপ মাত্র। এই হিসাবে ক্ষুদ্রতম দ্বীপ রাষ্ট্র। বিশাল মহাসাগরে এমন
এক জায়গায় নাউরু অবস্থিত যে, এর আশেপাশে কোন দেশ বা দ্বীপ নেই। সবচেয়ে কাছের দ্বীপ
হচ্ছে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের কিরিবাতির বানাবা দ্বীপ। নাউরুর আরেকটা বিশেষত্ব হচ্ছে,
এটা পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যার কোন অফিসিয়াল রাজধানী নেই।
কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে বিভিন্ন
ধরনের সামুদ্রিক পাখির অভরায়ণ্য ছিলো প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে এই নাউরু অঞ্চলটি। তাদের
ফেলে যাওয়া বর্জ্য কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে জমতে জমতে উৎকৃষ্ট মানের ফসফেটের টিলায় পরিণত
হয়। পরবর্তীকালে এই ফসফেটের টিলা নাউরুর জন্য ‘স্বর্ণের
খনি’ হয়ে ধরা দেয়। ফসফেট কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়
একটি উপাদান এবং নাউরুতে যে ফসফেট পাওয়া যেত, সেগুলো ছিলো পুরো পৃথিবীতে সর্বোৎকৃষ্ট
মানের।
১৯০৬ সালে জার্মনরা প্রথম
নাউরুর এই ফসফেট খনির সন্ধান পায়। ‘প্যাসিফিক ফসফেট কোম্পানি’ এর নামে এখান থেকে তারা ফসফেট উত্তোলন শুরু করে। এ অবস্থা চলতে থাকে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা পরাজিত হলে ‘ব্রিটিশ ফসফেট কমিশন’ এর নামে নাউরু থেকে ফসফেট উত্তোলন চলতে থাকে। আর
এর সুবিধা নেয় ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও অবস্থা
প্রায় একই ছিলো। ১৯৬৮ সালে নাউরু স্বাধীনতা পায়। ১৯৭০ সালে ২১ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান
ডলার দিয়ে নাউরু ফসফেট কোম্পানি কিনে নেয়।
![]() |
| নাউরু আইল্যান্ড - পৃথিবীর দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্রের করুণ পরিণতি |
এরকম একটা অবস্থা ছিল যে,
নাউরুর হারাবার কিছুই নেই। ফসফেট শেষ হয়ে গেলেও বিভিন্ন দেশে যে বিনিয়োগ আছে, তা দিয়ে
অনায়াসে চলে যাবে।
কিন্তু সবকিছু আসলে নিয়ম
মেনে চলে না। ৯০ দশকের শুরুর দিকেই নাউরু বুঝতে পারল, তাদের খনি শেষ হয়ে আসছে। আগের
মত বিলাসী জীবন চালু রাখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা ঋণ করা শুরু হল। তারা একটি বিমানবন্দর
বানায়, যার উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমা দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা। নিজেদের দেশে খাদ্য উৎপাদন
করার চেয়ে তারা বহির্দেশ থেকে খাবার আনার দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে থাকে। সেজন্য তারা
সাতটি বোয়িং বিমান কেনে, যা একসাথে নাউরুর ১০ শতাংশ জনগণ বহন করতে সক্ষম।
তাদের এই বিলাসিতা যেন
শেষ হবার নয়। সবকিছু একসাথে দেখভাল করার জন্য তারা একটি নাউরু ট্রাস্ট গঠন করে। কিন্তু
সরষের মধ্যে ভূত থাকলে যা হয়! অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অবাস্তব পরিকল্পনা- সবকিছু নাউরুকে
নিঃস্ব করে দিতে শুরু করে। সরকারি লোকজন রাষ্ট্রের টাকায় বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন
করতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, লন্ডন এবং ফিজির মতো দেশগুলোতে তৈরি করে নিজেদের
বিলাসবহুল হোটেল। এর ফলে তারা প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার করতে থাকে।
ফসফেট উত্তোলনের আগে নাউরুবাসী
নারিকেল চাষ আর মাছ ধরে খাবারের জোগান দিত। উর্বর মাটি থাকায় ভাল ফসলও হত। যখন খনির
কাজ শুরু হল, তখন তারা কৃষিকাজ ছেড়ে দিল। জমির মালিক ফসফেট বিক্রির একটা অংশ পেত বলে,
বলতে গেলে বিনা পরিশ্রমে তাদের কাছে টাকা আসত। খাবার উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় বিদেশ
থেকে খাবার আসত। ঐতিহ্যবাহী সবজি আর মাছের বদলে তারা খেতে শুরু করল টিনজাত মাংস, আলুর
চিপস, বিয়ার। এসব খেয়ে নাউরুতে দেখা দিল স্থূলতা আর ডায়াবেটিকস। বর্তমান নাউরুর দিকে
তাকালে দেখা যাবে, সেখানে ৭০ শতাংশ জমি আছে যাতে কোনোপ্রকার চাষাবাদ সম্ভব না, নিম্নমানের
খাবার এবং নানা রোগে ভুগতে থাকা জনগণ। নাউরুর ৯৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৯৩ শতাংশ নারী স্থূলতার
শিকার। মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নাগরিকের রয়েছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস। কিডনি বিকল এবং হৃদরোগ
সেখানে খুবই স্বাভাবিক। সেই সাথে নাউরুর ৯০ শতাংশ নাগরিকই বেকার।
এখন যে আবার কৃষিকাজ শুরু
করবে, সেই উপায়ও নেই। কারন একসময়ের চোখের মনি ফসফেট। পুরো নাউরুই আসলে ফসফেটের খনি,
এর ফলে দ্বীপের প্রায় ৯০% জায়গা ফসফেটের জন্য খনন করা হয়েছে। যখন ফসফেট শেষ হল, তখন
দেখা গেল, পুরো দ্বীপ ধূসর চুনাপাথরের চূড়ায় ভরা। কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা প্রায় ৭৫ ফুট
লম্বা। ঐ জায়গায় কৃষি কাজ তো দূরের কথা, ভালভাবে হাঁটাও যায় না। সমুদ্রের পানির সাথে
ফসফেট মিশে সামুদ্রিক পরিবেশও নষ্ট হয়ে আছে। ফসফেটের খনির কারনে দ্বীপের জলবায়ুও পরিবর্তন
হয়ে গেছে। একে তো বিশাল এলাকা জুড়ে গাছ নেই। খনি এলাকা থেকে উঠা গরম বায়ু মেঘ সরিয়ে
দেয়, ফলে বৃষ্টি হয় না। এবং মোটামুটি নিয়মিত খরা চলে। এই সমস্যা কিন্তু সহসা হয় নি।
যখন ফসফেট ছিল, তখন এগুলোকে কেউ সমস্যা মনে করত না। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা না বুঝলে
যা হয় আর কি।
একসময়ের বিশাল প্রতিপত্তির মালিক নাউরুর বর্তমান করুণ দশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বদা সচেতন থাকা দরকার এবং দুর্নীতির ফলাফল হতে পারে এরকম মারাত্মক ভয়াবহ।

