চটচটে নয়, শুকনো হতে মানা
দেখতে হবে ধবধবে চাঁদপানা
এমন মিষ্টি ভূ - ভারতে নাই
নবীন ময়রা এমন মিষ্টি চাই।
কী মনে পড়লো তো? রসের গোল্লা, যাতে মিশে রয়েছে প্রেমের গন্ধ, বাঙালির আত্মা, আর অনেক লড়াইয়ের জবাব।
বিয়ের অনুষ্ঠান হোক বা জন্মদিন। বাঙালির শেষ পাতে একটু মিষ্টি না হলে ঠিক জমে না। হরেক রকম সেই মিষ্টির ভিড়ে যদি রসগোল্লা থাকে তো কথাই নেই।
রসগোল্লা ও বাঙালির এই সম্পর্ক কিন্তু আজকের নয়। তার হিসেব খুঁজতে গেলে যেতে হবে সেই ১৮৬৮ সালে। বাগবাজারের নবীন ময়রা তখন সবে মিষ্টি বানানোয় হাত পাকাচ্ছেন। একদিন ছানার গোল্লা পাকিয়ে চিনির শিরায় ফেলে তৈরি করে ফেললেন এক অপূর্ব বস্তু। আর বাঙালি পাতে পেল রসগোল্লা। সেই থেকে বাঙালির রসনা তৃপ্তিতে এক অটুট বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেল রসগোল্লা। সেই রসগোল্লার কদর আজ গোটা পৃথিবীজুড়ে।
এতক্ষনে নিশ্চয় বুঝে নিয়েছেন, আজকে আমরা রসগোল্লার ইতিহাস জানতে চলেছি।
তো চলুন শুরু করা যাক...
নবীন চন্দ্র দাস জোড়াসাঁকোয় প্রথম তার একটি মিষ্টির দোকান খুলেছিলেন ১৮৬৪ সালের দিকে। তবে বেশিদিন না চলায় তিনি সেটি বন্ধ করে ১৮৬৬ সালে বাগবাজারে একটি মিষ্টির দোকান চালু করেছিলেন। এখানে তার প্রথম মিষ্টি ছিল সন্দেশ, পরে দুই বছর চেষ্টা করে তৈরি করেন রসগোল্লা।
দাশের এই আবিষ্কারটি বাঙালীদের কাছে খুব বিখ্যাত হয়েছিল। কথিত আছে যে, বাগবাজারের বিখ্যাত ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্য যখনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করতে যেতেন তখন এই রসগোল্লা নিয়ে যেতেন।
রসগোল্লার আবিষ্কার নিয়ে উইকিপিডিয়া কিন্তু অন্য কথা বলছে, রসগোল্লার আদি উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে। বিশেষ করে, পর্তুগিজদের সময় পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার ময়রারা ছানা, চিনি, দুধ ও সুজি দিয়ে গোলাকার এক ধরণের মিষ্টান্ন তৈরি করেছিলেন। সেটাই ক্ষীরমোহন বা রসগোল্লা নামে পরিচিত। রসগোল্লা আবিষ্কারক হিসেবে কলকাতায় যে নবীন চন্দ্রের কথা বলা হয়, তিনি বরিশাল অঞ্চলের লোক। এক সময় তিনি পটুয়াখালীর কাছেই থাকতেন। তার হাত ধরেই শিল্পটি কলকাতায় বিস্তার লাভ করে। আর বরিশাল এলাকার হিন্দু ময়রাদের বংশধর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা কিংবা উড়িশ্যায় বিস্তার লাভ করে। ১৪৫ বছর ধরে মিষ্টি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মরণ চাঁদ গ্র্যান্ড সন্স। প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে ঢাকায়। ফার্মগেট শাখার ব্যবস্থাপক রবীন্দ্রনাথ রায় মনে করেন, রসগোল্লা বাংলাদেশের কারিগরদেরই একটি অসাধারণ উদ্ভাবন।
তবে রসগোল্লা আবিষ্কারের বিষয়ে আরেকটি মত উল্লেখ আছে। কেউ কেউ মনে করেন, রানাঘাটের হারাধন ময়রা প্রথম রসগোল্লা বানান। তার দোকানে একবার চিনির রসে দুর্ঘটনাক্রমে কিছু ছানার গোল্লা পড়ে যায়। আর সেটাই হয়ে যায় রসগোল্লা।
এদিকে উড়িশ্যা আবার রসগোল্লাকে তাদের ৮০০ বছরের পুরনো নিজস্ব আবিষ্কার বলে দাবি করে। তাদের প্রচলিত মত, রথযাত্রা শেষে সাত দিন খালার বাড়ি কাটিয়ে মন্দিরে ফেরার সময় রসগোল্লা ছিলো জগন্নাথ দেবের ‘পাসওয়ার্ড’। স্ত্রী লক্ষ্মীর মান ভাঙিয়ে মন্দিরে ঢুকতে হত তাকে। হাঁড়িভরা রসগোল্লা ছাড়া বৌয়ের মন গলান সহজ ছিল না। সেখান থেকেই নাকি রসগোল্লার আবির্ভাব। এ নিয়ে তো বাংলা আর উড়িশ্যার মধ্যে বেশ একটা আইনি লড়াই শুরু হয়ে গেলো, কিন্তু শেষ-মেশ দু’বছরের আইনি লড়াইয়ের পর জিওগ্র্যাফিক্যাল ইন্ডিকেশন জানিয়ে দিলঃ ওড়িশা নয়, রসগোল্লা বাংলার সম্পদ। কারণ নামে মিল থাকলেও দুই রাজ্যের রসগোল্লায় কিছু অমিল রয়েছে।
রসগোল্লা আবিস্কারের গল্পে নবীন ময়রার নামটাই বেশিবার উঠে এসেছে।
তবে রসগোল্লা যেখানেই আবিষ্কার হোক না কেন, নবীন চন্দ্র দাসের হাত ধরেই এই রসের গোল্লা যখন ধীরে ধীরে বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল, তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হল চারিদিক। সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানে অতিথি অভ্যাগতদের পাতে পড়তে লাগল এই মিষ্টি। দেশ-বিদেশেও এর চাহিদা বাড়তে থাকল।
সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে ১৯৩০ সালে নবীনের একমাত্র পুত্র কৃষ্ণ চন্দ্র দাস মহাশয়ের হাত ধরে শুরু হল রসগোল্লার প্রক্রিয়াকরণের প্রস্তুতি। অভিনব পদ্ধতিতে টিনের কৌটোর মধ্যে ভরা হতে থাকল রসগোল্লা। যাতে তাদের আয়ু বাড়ানো যায় ও খুব সহজেই সেই সব টিনের ক্যান রপ্তানি করা যায়। এক কথায় ‘ক্যানড রসগোল্লা’। আজ যে রসগোল্লার এত জনপ্রিয়তা, তার অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন এই কৃষ্ণ চন্দ্র দাস বা কে সি দাস। পরবর্তী সময়ে কেসি দাসের নামের ব্র্যান্ডিং এবং তাঁর বংশধরদের তৈরি করা মিষ্টি শুধু ভারতে নয়, গোটা পৃথিবীতেই সুনাম অর্জন করেছে।
গ্রাহকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইতেও খোলা হয়েছে এই অভিজাত মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠানের ব্রাঞ্চ। রয়েছেন ৫০০-এর কাছাকাছি কর্মী। এছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে রসগোল্লার অর্ডার তো রয়েছেই।
আজ এখানেই শেষ করছি। লেখাটি ভাল লাগলে অবশ্যই কমেন্ট ও শেয়ার করবেন। ধন্যবাদ।
ইউটিউবে দেখুনঃ

