মানব ইতিহাসে টাইটানিক জাহাজের ডুবি এক অনন্য ট্র্যাজেডি। ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে জাহাজটি বরফখণ্ডে ধাক্কা খেয়ে তলিয়ে যায়। কিন্তু এর পেছনে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা বা প্রকৃতির দুর্ঘটনা নয়, বরং অদ্ভুত রহস্যময় কিংবদন্তির কথাও শোনা যায়। সেই কিংবদন্তির কেন্দ্রে রয়েছে এক “অভিশপ্ত মমী”র কাহিনী, যা মানুষকে আজও শিহরিত করে।
অভিশপ্ত মমীর উৎপত্তি
কথিত আছে, এই মমী ছিল একজন মিশরীয় পুরোহিতার, যিনি প্রায় তিন হাজার বছর আগে দেবী আমুন-রা-কে নিবেদিত ছিলেন। তার মৃত্যু রহস্যময় ছিল এবং সমাধি থেকে বের করা এই মমীকে ঘিরে ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে শুরু করে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে একদল প্রত্নতত্ত্ববিদ যখন মমীটিকে আবিষ্কার করেন, তখন থেকে দুর্ভাগ্যের সূত্রপাত হয়।
মমীটি যেই সংগ্রাহক কিনতে চেয়েছিল, তার পরিবারে ঘটে একের পর এক অদ্ভুত দুর্ঘটনা। এরপর যখন মমীটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থানান্তর করা হয়, তখন সেখানকার কর্মচারীরা নানা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন—কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, কারও মৃত্যু ঘটে অপ্রত্যাশিতভাবে, আবার কখনও রহস্যজনক শব্দ শোনা যেত মমীর কাছাকাছি। ধীরে ধীরে লন্ডনে এই মমীকে ঘিরে “The Unlucky Mummy” নামক অভিশাপের গল্প ছড়িয়ে পড়ে।
মমী এবং টাইটানিকের সংযোগ
১৯১২ সালে গুজব ছড়ায় যে, এই অভিশপ্ত মমীটিকে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কে পাঠানো হচ্ছে এক ধনী আমেরিকান সংগ্রাহকের জন্য। বলা হয়, নিরাপত্তার কারণে মমীটিকে একটি বাক্সে ভরে টাইটানিকের কার্গো ডেকে রাখা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর কাহিনী।
যাত্রীরা নাকি জাহাজের ভেতরে মমীর বাক্স থেকে অদ্ভুত শব্দ শুনতেন। কেউ কেউ দাবি করেছিল, মাঝরাতে এক নারীর ক্রন্দনের মতো শব্দ ভেসে আসত। এমনকি কয়েকজন কর্মচারী নাকি বলেছিল, তারা ছায়ার মতো এক নারীর অবয়ব দেখতে পেয়েছে কার্গো ঘরে। এইসব ভয়ঙ্কর কাহিনী জাহাজ ডোবার পর আরও জোরালো হয়।
টাইটানিকের পরিণতি
১৪ এপ্রিল রাত, টাইটানিক আঘাত হানে বিশাল বরফখণ্ডে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দাবি করা সেই জাহাজটি মহাসাগরের তলায় চলে যায়। ১৫০০ এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এরপর থেকে গুজব রটে যায়—“অভিশপ্ত মমী”র শক্তির কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
যদিও অফিসিয়াল রেকর্ডে টাইটানিকে কোনো মমী পরিবহনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও এই গল্প মানুষের কল্পনাকে দোলা দেয়। কারণ, টাইটানিকের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জাহাজের এমন ভয়াবহ পরিণতির পেছনে অনেকেই কেবল একটি দুর্ঘটনা মানতে পারেননি।
বাস্তবতা না কুসংস্কার?
গবেষক ও ইতিহাসবিদরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে, টাইটানিকে কোনো মমী ছিল না। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের “Unlucky Mummy” আজও লন্ডনে প্রদর্শিত আছে এবং কখনোই আমেরিকায় পাঠানো হয়নি। তবে রহস্যময় ঘটনাগুলো, মানুষের কল্পনা, এবং ভয়াবহ দুর্ঘটনার মিলন এই কিংবদন্তিকে অমর করে তুলেছে।
টাইটানিকের ডুবি বাস্তবে ছিল প্রকৃতির নির্মমতা আর মানব অহংকারের পরিণতি। তবে “অভিশপ্ত মমী”র গল্প সেই ট্র্যাজেডিকে এক রহস্যময় আবহে ঢেকে দেয়। সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন, এই কিংবদন্তি প্রমাণ করে মানুষ সবসময় অজানাকে ঘিরে গল্প বানাতে চায়, ভয়ের মধ্যে রহস্য খুঁজে নিতে চায়। আর সেই কারণেই “অভিশপ্ত মমী এবং টাইটানিকের পরিণতি” আজও ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রহস্যগল্প হিসেবে বেঁচে আছে।

