চীনা খাবারের সুনাম দুনিয়াজুড়ে। আমাদের দেশেও চীনা খাবারের কদর কম নয়। কিন্তু চীনে বেড়াতে গেলে তাদের ভালো খাবার বলতে যা দেখবেন, তা একেবারেই অন্য রকম। বাংলাদেশে যারা চাইনিজ খাবার মজা করে খান, তারা যদি মনে করেন চীনা রেস্টুরেন্টে বা চীনে সেই একই খাবার। তাহলে ভুল করবেন। কারণ চীনের আর বাংলাদেশের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এর মধ্যে বিস্তর ফারাক।
বাংলাদেশীদের কাছে চীনাদের ভাল আর খারাপ খাবার সম্পর্কে আজকের এই ভিডিও।
শুরুটা ভাল মনে হলেও শেষটা ভাল নাও লাগতে পারে। অবাক হবার কিছু নেই। আমাদের চোখে অর্থাৎ বাঙ্গালিদের চোখে, ভিডিওর প্রথমে চীনাদের ভাল ভাল খাবার গুলো তুলে ধরেছি, আর শেষে থাকছে জঘন্য সেই সব খাবারের তালিকা।
তাই ধৈর্য ধরে সম্পূর্ণ ভিডিও টা দেখতে থাকুন। আর খাবারের মাঝে মাঝে চীনাদের সম্পর্কে নানা রকম তথ্য থাকছে আপনাদের জন্য।
তো চলুন শুরু করা যাক। Intro
কথায় বলে, চীনে গেলে চিড়া-মুড়ি বেঁধে নিয়ে যাও! কারণ, সবাই কিন্তু আসল চায়নিজ খাবার সহজে খেতে পারবেন না। চীনা খাবার খেতে গেলে আপনার নাক আপনার সঙ্গে বিদ্রোহ করতে পারে। চায়নিজ খাবারে মূলত পাঁচ ধরনের গন্ধ থাকে। ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধের সঙ্গে তাল রেখে এসব গন্ধের হেরফের হয়। মিষ্টি, টক, নোনা, তেতো আর ঝাল—এ পাঁচ স্বাদের খাবার আপনি পাবেন। চীনের অঞ্চলভেদে ঘ্রাণ আর স্বাদের হেরফের পাবেন। যেমন সিচুয়ানে ঝাল খাবার পাবেন বেশি। উত্তরাঞ্চলে নোনা আর দক্ষিণাঞ্চলের খাবারে টকের প্রাধান্য বেশি।
মুরগীর সেদ্ধ পা, ঝুঁটি, ঠোঁটসহ মাথা, নাড়িভূড়ি- বাংলাদেশে ফেলে দেওয়া হলেও এসব খাবারই এখানে সুস্বাদু মেন্যুর তালিকায়। আর শুকরের মাংস তাদের খাবারের অন্যতম উপাদন। সব খাবারেই কোনো না কোনোভাবে শুকরের মাংস জুড়ে দেওয়া যেন চীনা রন্ধনশিল্পীদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট। এটা দিয়ে বেশ তৃপ্তিতেই আহার সারে চীনারা।
চীনের মানুষ সকালের নাস্তা খেয়ে নেন ৮টার মধ্যেই। এরপর দুপুর ১২টায় মধ্যাহ্ন ভোজ। সন্ধ্যা ৬টায় রাতের খাবার।
চীনারা নুডুলস খেতে খুব বেশি পছন্দ করে। তবে চীনারা সব খায়। প্রশ্ন হতে পারে, কি খায় না? তাদের খাবারের তালিকা দেখলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। বলা হয়—যা নড়াচড়া করে, তাই খেয়ে নিতে পারে চীনারা। মুরগি, হাঁস, গরু, ভেড়া থেকে শুরু করে সাপ-ব্যাঙ-ইঁদুর এমন কি বাদুড় পর্যন্ত। ধারনা করা হচ্ছে এই বাদুড় থেকেই সর্বনাশী করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। যার প্রাদুর্ভাবে এপর্যন্ত ৩০০ ও বেশি মানুষ প্রান হারিয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ এই ভাইরাস দারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
ঘন দুধে মিষ্টি দিয়ে সেমাই। এমন খাবারের সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে চীনে কিন্তু সেমাই খাওয়া হয় একটু অন্যভাবে। সামুদ্রিক কাঁকড়ার সঙ্গে সেমাই দিয়ে খেতেই পছন্দ চীনাদের। সেমাইকে তারা নুডলস হিসেবে খেতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন।
চীনারা সবচেয়ে বেশি খায় সবুজ সবজি। তাজা ফল ও ফলের জুস তাদের দারুণ পছন্দের খাবার। সতেজ সবজি হিসেবে আলু, বেগুন, পালং, লেটুস, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রোকলির পাশাপাশি ডায়েটারি ফাইবার যেসব সবজিতে বেশি থাকে, সেগুলো বেশি খায় তারা। তাদের এমন কিছু সবজি আছে, যা ঘাসপাতা বলে অনেকেই খেতে চান না। এতে তাদের অন্ত্রের নড়াচড়া পশ্চিমাদের চেয়ে বেশি হয়।
চীনারা হাড়-মাংস চিবিয়ে খায়, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। চীনারা অপচয় পছন্দ করে না। তাই অনেক সময় খাবারে টেবিলে আস্ত মাছ বা প্রাণী দেখতে পাবেন। যেসব মাছের কাঁটা বা হাড় নরম থাকে, তারা এসব চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। তাই তারা আলাদাভাবে হাড় ও কাঁটা খায়। তারা মনে করে, মজ্জার স্বাদ ও পুষ্টি বেশি।
নারিকেলের স্যুপ! নারিকেলের ভেতর গরম পানি তার ভেতর ৩/৪ টুকরো মুরগির মাংস। চীনাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এই স্যুপ।
চীনারা কাঁটাচামচ বা চামচ দিয়ে খেতে অভ্যস্ত নয়। তারা খাবার খাওয়ার সময় চপস্টিক ব্যবহার করে। দুটি কাঠির মতো ওই চপস্টিক দিয়ে অবশ্য সবকিছু কাটতে পারবেন না। খাবার যাতে চপস্টিকে সহজে তোলা যায় –- তার জন্য খারার সাইজ মতো কেটে তারপর রান্না করা হয়। আরেকটি মজার তথ্য জেনে রাখতে পারেন, তা হচ্ছে চীনারা বছরে ৪৫ বিলিয়ন জোড়া চপস্টিক ব্যবহার করে। বাঁশ ও নরম কাঠ দিয়ে এসব চপস্টিক তৈরি করা হয়।
চীনারা একই খাবার চাইলে নানা উপায়ে রান্না করতে পারে। যেমন: মাছ সেদ্ধ, ঝোল, ভাজি, রোস্ট, ম্যারিনেট, ঝাল, মিষ্টি নানা রকম করে রান্না করে থাকে। এর বাইরে চীনের সাংহাই ও শেনঝেন এলাকায় বিশেষ পাত্রের মধ্যে কাঁচা মাছ–মাংস সেদ্ধ করে খেতে দেখা যায়।
খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেয় চীনারা।
চীনাদের কাছে খাবার বিষয়টি ‘আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারি’ কথাটির মতো। চীনারা খাবার সাজিয়ে দিতে পছন্দ করে। তাদের কাছে মানুষ খাওয়ার আগে প্রথম কামড় দেয় চোখ দিয়ে। তারা এমন দৃষ্টিনন্দনভাবে খাবার সাজাতে পছন্দ করে, যাতে সাধারণ খাবারও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।
ঐতিহ্যবাহী চায়নিজ খাবার খেতে গেলে তার পরিবেশনটাও হয় ঐতিহ্যমাফিক। খাবার পরিবেশন করা হয় টেবিলের মাঝখানে আর অতিথিরা ভাতের বাটি নিয়ে তার চারপাশে বসে। রেস্তোরাঁগুলোতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ জনের বসার ব্যবস্থা থাকে। অতিথিরা দরজা থেকে একটু দূরে বসে যাতে মাছ-মাংস তার দিকে এগিয়ে আসছে এমনটা মনে হয়।
চীনারা মাছসহ বিভিন্ন প্রাণীর চামড়াও খায়। সেখানকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় চোখে পড়তে পারে কোল্ড ফিশ স্কিন।
এ তো গেল ভাল খাবারের অধ্যায়। আরে... এই যদি হয় ভাল খাবারের নমুনা...
অপেক্ষা করুন গুরু, সবে শুরু
১. কুকুরের মাংস- সর্বোচ্চ গৃহপালিত প্রাণী হিসেবেই আমরা কুকুরকে জানি। কিন্তু কোরিয়া, চীন, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামে কুকুরের ঠাঁই হয় খাবারের প্লেটে। বিশেষ করে কোরিয়ায় কুকুরের মাংস দারুণ জনপ্রিয় একটি খাবার।
ফিলিপাইনের খাবার নিয়ে আগে একটা ভিডিও আছে, দেখে নিতে পারেন এখান থেকে। তার আগে এইটা শেষ করেন।
২. মাতাল চিংড়ি- বাইজু নামক একটি শক্তিশালী অ্যালকোহল দ্রবণে চুবিয়ে রাখা হয় চিংড়ি মাছ। তারপর জীবন্ত এবং মাতাল চিংড়ি গুলোকে তুলে দেয়া হয় খাবারের প্লেটে। চীনে বিশেষভাবে প্রচলিত রয়েছে এই খাবারটি।
৩. কাসুমার্জু- কাসুমার্জু মানে শুক কীট দিয়ে তৈরি পনির। ভেড়ার দুধ দিয়ে তৈরি পনির রেখে দেয়া হয় অনেকদিন, যাতে সেখানে শুক কীট জন্ম নিতে পারে। কীট জন্ম নেয়ার পর পনিরের সঙ্গে তা খাওয়া হয় জীবিত অবস্থায়। ইতালীতেও তৈরি হয় এই পনির।
৪. গোখরা সাপের হৃদপিন্ড - ভিয়েতনাম ও চীনে সাহস এবং শক্তি বাড়ানোর জন্য খাওয়া হয় গোখরা সাপের হৃদপিণ্ড। জীবিত সাপের হৃদপিণ্ড বের করেই ঐ সাপের রক্ত দিয়ে খেতে হয় তা।
৫. বালুট- ফিলিপাইনে খুব জনপ্রিয় একটি খাবার। ভেতরে বেড়ে উঠা ভ্রুণসহ সিদ্ধ করা হয় হাঁসের ডিম। দেশটির রাস্তায় রাস্তায় দেদারসে বিক্রি করা হয় এই বালুড।
৬. পাখির বাসার স্যুপ- দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া বিশেষ করে চীনে পাখির বাসার স্যুপ বিশেষ জনপ্রিয় এবং অত্যন্ত দামি একটি খাবার। ফিড গোত্রের এক ধরনের পাখি মুখের লালা দিয়ে বাসা তৈরি করে। আর এই বাসা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় এই স্যুপ।
৭. সাগু ডিলাইড- সাগুর মধ্যে জন্মানো এক ধরনের পোকা খাওয়া হয় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে। সাধারণত এই পোকাগুলোকে জীবন্ত চিবিয়ে কিংবা সেদ্ধ করে মাংসের মত করে খাওয়া হয়।
৮. লীচ লাইম-এখানে জোঁক চাষ করা হয় খাওয়ার জন্য। জোঁকের মাংস অনেক জনপ্রিয় চাইনার কিছু কিছু অঞ্চলে।
ব্ল্যাক পুডিং- আফ্রিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশে খাওয়া হয় এই ব্ল্যাক পুডিং। মূলত পশুর জমাট বাঁধা রক্তের সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই ব্ল্যাক পুডিং। শুধু রান্না করা রক্ত নয় দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশে হাঁস বা শূকরের কাঁচা রক্ত সরাসরি পুডিং করে খাওয়া হয়।
এছাড়াও ইদুর ও বাদুড়ের মাংস বেশ জনপ্রিয় চীনে।
মাকড়সা ভাজা: অদ্ভুত খাবারের তালিকায় আছে বড় বড় মাকড়োসা ভাজা। যেগুলো দেখলে খাওয়া তো দূরের কথা, ভয়ে আপনার গা শিরশির করবে। চীনের রাস্তায় মাকড়োসা ভাজা প্যাকেট করে বিক্রি করা হয়। হনজু শহরের রাস্তায় চীনের বিখ্যাত এই মাকড়সা ভাজি খাবার পাওয়া যায়।
টিকটিকি ভাজা: এমন অদ্ভুত খাবার মানুষকে খেতে কখনও শুনেছেন? চীনারা খায়। টিকটিকি ও সরিসৃপ জাতীয় প্রাণীগুলো তারা আস্ত তেলে ভেজে খায়। এটা চীনের খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার। রাস্তার ধারে প্লেটে সাজিয়ে রাখা দেখা যায় আস্ত টিকটিকি ভাজা।
কাঁকড়া বিছে ভাজা: বিষাক্ত কাঁটা যুক্ত কাঁকড়া বিছের কামড়ে বছরে অনেক মানুষ মারা যায়। আর চীনারা সেই কাঁকড়া বিছেকে তেলে ভেজে তারপর লবন-মশলা মিশিয়ে খেয়ে নেয়। তাদের কাছে এটা অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার। এটার ভেতরটা অনেকটা চিংড়ি মাছের মতো। হালকা বিট লবন মিশিয়ে কাঁকড়া বিছে খেতে মন্দ লাগে না।
সাপের মাংসের স্যুপ: আজব শোনালেও সত্য, সাপের মাংসের স্যুপ খায় চীনারা। চীনের মানুষ বিভিন্ন বিষাক্ত সাপকে চামড়া ছাড়িয়ে স্যুপ বানিয়ে খায়। গরম গরম সাপের স্যুপের সাথে শক্ত শক্ত মাংস খেতেও বেশ সুস্বাদু। সাথে জিভে জল আনা মশলা তো আছেই। স্ট্রিট ফুড হিসেবে সাপের স্যুপ চীনে খুব জনপ্রিয়।
শূকরের নাক: শূকরের নাক চীনের খুব বিখ্যাত একটি খাবার। শূকর জবাই করার পর তার মাথা থেকে চামড়াসহ নাক কেটে নেওয়া হয়। তারপর নাকের ফুটোগুলোর মধ্যে নানা রকমের মশলা ঢুকিয়ে রান্না করা হয়। খেতে গরুর কলিজার মতো এই খাবারটি চীনে বেশ জনপ্রিয়।
ভেড়ার পুরুষাঙ্গ: অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্য। ভেড়ার পুরুষাঙ্গ ভাজি করে খায় চীনারা। ভেড়ার পুরুষাঙ্গে মশলা মাখিয়ে ডুবন্ত তেলে ভাজি করে রাস্তার ধারে বিক্রি হয়। চীনাদের কাছে এটা খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার।
এতক্ষনে গা গুলিয়ে এসেছে নিশ্চয়।তো বুঝতেই পারছেন চীনারা কতটা ভোজন রসিক।

