যুগে যুগে মহামারির প্রাদুর্ভাব, বিশেষ করে অজ্ঞাত কোনও ভয়াল সংক্রমণ ব্যাধির প্রাদুর্ভাবে ‘মৃত্যুর কালোছায়া’ ঘনিয়ে আসার মতো ঘটনাগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক একটি বীভৎস, অমানবিক ও কালো ইতিহাস বহন করছে। পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়া এসব মহামারি নানা সময় যেমন বিপর্যস্ত করেছে মানব সভ্যতা তেমনি কোথাও কোথাও আবার নিঃশেষ করে দিয়েছে বহু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব। আধুনিকতার চরম উৎকর্ষকালেও এমন মহামারির আগ্রাসনে সম্প্রতি আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল পৃথিবী। চীনের উহান শহর থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস নামের এক অজ্ঞাত গুপ্তহন্তকের কড়ালগ্রাসে নিপতিত হয়েছিল আধুনিক মানব সভ্যতা। কারও কারও মতে, পাপাচারের চরম পরিণতি স্বরূপ স্রষ্টার অভিশাপে এমন সব মহামারি। কেউ বলছেন জলবায়ু বিপর্যয় আর পরিবেশ বিনষ্টের প্রতিক্রিয়া। আবার কেউ মনে করছে, হাত ফসকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে আসা মানবসৃষ্ট কোনও জীবাণু অস্ত্রের রসদ এই ভাইরাস। তবে এমন সব তথ্য ছাপিয়ে এক বিস্ময়কর তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেল ইতিহাসের পাতায়।
মহামারি চক্রের কালচিত্র - মহামারির ভয়াল ইতিহাস
0
আগস্ট ০১, ২০২৫
চলুন যেনে নিই পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক কিছু মহামারীর কালো থাবা সম্পর্কে। ১৩২০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত।
শক্ত প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বলছে, যেভাবে বা যে পন্থাতেই হোক, গড়ে প্রতি একশ বছরে অন্তত একটি মহামারির প্রলয়-কাঁপন উঠেছে পৃথিবীর বুকে। কখনওবা একাধিক কিংবা ততোধিক। সভ্যতা আর আধুনিকতার চরম সাধ্য অর্জনে যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত খুবলে নিচ্ছে প্রকৃতিকে। সেখানে ধারাবাহিক এমন শতবর্ষী এক একটি প্রলয়ে নিজের সহ্যের সীমা অতিক্রমের প্রতিক্রিয়া জানান দিয়ে আসছে প্রকৃতি। যার প্রতিটির মাঝে রয়েছে গোনা একশ বছরের আশ্চর্য সময়ের ব্যবধান। এ যেন এক সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক বাস্তুসংস্থান চক্রের মতো। যেখানে বার বার মানুষ-প্রকৃতির মিতালীর একেবারে ভিন্ন রূপটিই আবর্তিত হয় চরম বৈরিতায়।
মহামারির প্রাদুর্ভাবের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়ের এই ধারাবাহিক ইতিহাসের কালচিত্র পর্যালোচনা যদি খুব নিকট অতীত থেকেও শুরু করা যায় তবে ফিরে তাকাতে হবে ১৩২০ সালের প্রেক্ষাপটে।যে সময় সারা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াল প্লেগের প্রাদুর্ভাবের ফলে শুধু ইউরেশিয়া অঞ্চলেই মৃত্যু হয়েছিল অন্তত ২০ কোটি মানুষের। যার নাম ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ অব বুবোনিক প্লেগ’। ১৩২০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্লেগের প্রাদুর্ভাব ক্রমে মহামারি রূপ ধারণ করে প্রকট হয়ে ওঠে। আর এর প্রভাবে ১৩৪৭-১৩৫১ সালের মধ্যে ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশের (ইউরেশিয়া) ৭ থেকে ২০ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
মধ্য এশিয়ার সমভূমিতে বা চীনের দিকে এই রোগের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। এরপর এটি সিল্ক রোড হয়ে ১৩৪৩ সালের দিকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত পৌঁছায়। মূলত বণিকদের জাহাজে বসবাস করা ‘কালো ইঁদুর’ ও ‘ইঁদুর মাছি’ নামক দু’টি প্রজাতির প্রাণির মাধ্যমে এটি ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের মোট জনসংখ্যার ৩০-৬০ ভাগ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
বুবোনিক প্লেগের প্রকোপ ক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যার প্রভাব প্রথম প্রলয়ের প্রায় একশ বছর পর পর্যন্ত ভোগায় পৃথিবীর মানুষকে। এই প্লেগের দ্বিতীয় প্রলয় আঘাত আসে ১৪২০ সাল নাগাদ। এই মহামারির কবলে পড়ে ১৪০০ শতাব্দীতে বিশ্বের জনসংখ্যা ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৭৫ লাখে নেমে আসে। মানুষের প্রাচীনতম ফসিল, সভ্যতার ইতিহাস সাক্ষী দেয় বিভিন্ন রোগ কীভাবে পাল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর গল্প।মহামারি কয়েক মাসে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল জনপদ। এ যেন অভিশাপ- ভেবে পালিয়ে যাচ্ছিল নগরবাসী। কিন্তু মৃত্যু পিছু ছাড়েনি। ১৫ বছরের ব্যবধানে রোম রীতিমতো ভুতুড়ে শহরে পরিনত হয়। ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে গ্রিসে। এথেন্স তখন গ্রিসের ফুসফুস। প্লেগ এসে তছনছ করে দেয় এথেন্সকে। এক লাখ মানুষ মারা যায় সে সময়। একশ বছর পর ইউরোপ, মিসর ও পশ্চিম এশিয়ায় প্লেগের ছোবল লাগে। গোটা পৃথিবীর ৪০ শতাংশ মানুষ সে সময় মারা গিয়েছিল। মানুষ ঘর ছেড়ে বের হতো না। সেই শতাব্দীতে এটি সুসভ্য রোমান সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে তা ‘প্লেগ অব শ্যারো’ নামে ছড়িয়ে পড়েছিল বর্তমান ইরানে। মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে মাত্র এক বছরে এক লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা ধারণা করা হয় এই মহামারির প্রভাবে। কেউ রোগাক্রান্ত হলে ছুটে পালাত তার সঙ্গী-স্বজনরা। পার্সিয়ার অর্ধেক মানুষই মারা যায় তখন।
আনুমানিক ১৬২০ সাল নাগাদ লন্ডন দেখেছিল মহামারির আসল রূপ।গুটি বসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফাস— এমন অজানা আরও একাধিক ভাইরাস জ্বরে সে সময়ের লন্ডন মৃত্যুর মুখে পড়ে। ঘরে ঘরে অজানা রোগে মানুষ মরতে শুরু করে। মৃত্যুর এমন মিছিল লন্ডন এর আগে বা পরে কবে দেখেছিল কে জানে। লন্ডনের ৯০ শতাংশ মানুষই নানা অজানা রোগে আক্রান্ত হয়। পুরো লন্ডন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।
অপরদিকে প্রায় সমসাময়িক একটি মহামারির কবলে পড়ে ইউরোপের আরেক দেশ ইতালি।
১৬২৯-১৬৩১ সাল নাগাদ ইতালিতে ছড়িয়ে পড়া প্লেগ রোগে আড়াই লাখ মানুষ মারা যায়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৬৬৫ সালে গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন ও গ্রেট প্লেগ অব অস্ট্রিয়া কয়েক লাখ প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। ‘গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন’— এ লন্ডনের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারের সাথে সাথে সৈনিকদের মাধ্যমে ভারতবর্ষে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে। ভারতবর্ষ ছাড়াও স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায় দেড়শ বছরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ কলেরায় মারা যায়।
ইতিহাসের তথ্যমতে, সপ্তদশ শতকে দুনিয়াজুড়ে ২০ কোটি মানুষ শুধু প্লেগ রোগে মারা যায়। যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াল রূপটি ছিল ১৭২০ সালে ফ্রান্সের দ্য গ্রেট প্লেগ অব মার্শেই মহামারির আঘাতে। এটি ছিল বিশেষ এক প্রকার বুবোনিক প্লেগ। এই প্লেগে শুধু মার্শেই নগরীতে ৫০ হাজার আর পুরো ভলকান ও ফ্রান্সজুড়ে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ শতকে ভলকান অঞ্চলেও মহামারি আঘাত করে। এর মাঝে ৫০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল শুধু ১৭৩৮ সালের প্লেগেই। এ সময় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে, মৃতদেহ কবর দিতে খোড়া হয় একের পর এক গণকবর।
একই শতকে রাশিয়া ও পার্সিয়া ভয়ঙ্কর মহামারির মুখে পড়ে। দুই লাখ মানুষ মারা যাওয়ার পর পার্সিয়া অভিশপ্ত হিসেবে গণ্য হয়। ইউরোপ ও এশিয়ায় এক লাখ মানুষ কলেরায় মারা যায় ১০ বছরের ব্যবধানে। সে সময় কলেরা প্রতিরোধের কোনও উপায় খুঁজে পায়নি বিশ্ব।
১৭২০ সালের প্লেগ প্রলয়ের ১০০ বছর পর ১৮২০ সালে শুধু ভারত ও পূর্ব এশিয়ায় কলেরা রোগে মারা যায় কয়েক লাখ মানুষ। সময়ের সঙ্গে এই কলেরা মহামারি রূপ ধারণ করে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাংকক, মেনিলা, ইরান, বাগদাদ, সিরিয়া হয়ে জানজিবার পর্যন্ত। আর আফ্রিকা ও ইউরোপে বসন্ত রোগে মারা যায় প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ।
তবে এই শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারিটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ইয়েলো ফিভার বা ইয়েলো প্লেগের প্রাদুর্ভাব। দেশটির ফিলাডেলফিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে শুরু হওয়া ইয়েলো ফিভারের প্রাদুর্ভাব অল্প সময়ের মধ্যেই মহামারি রূপ ধারণ করে। এতে নগরের ১০ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ, প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ মারা যায়। এর প্রভাবে উচ্চ তামপাত্রাসহ সারা দেহে সৃষ্টি হতো প্রচণ্ড যন্ত্রণা। যার এক পর্যায়ে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ঘটতো ভয়াবহ মৃত্যু। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো এক প্রকার মশা এই রোগের জীবাণু বহন করত।
১৯১৬-১৯২০ সাল সময়সীমার মধ্যে ইউরোপের দেশ স্পেনের বুকে মহামারি রূপে প্রাদুর্ভাব বিস্তার করে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামের এই মরণব্যাধি। H1N1 ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট এই প্রাণঘাতি জ্বরে সারা বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি মানুষ। যার মধ্যে ১ কোটিরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
প্রতিটি মহামারির সঙ্গে পরবর্তী মহামারির শুধু এই ধারাবাহিক সময় চক্রের নয়, মিল রয়েছে সংক্রমিত ব্যাধির ক্ষেত্রেও। যার ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু এর পর আরও একটি ব্যাধি COVID-19 এর মহামারি প্রাদুর্ভাব ঘটলো ২০২০ সালে। আর এবারের সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ভাইরাসটি হচ্ছে ‘নোভেল করোনাভাইরাস’। ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ এই ভাইরাসের সংক্রমণে অজ্ঞাত রোগের প্রাদুর্ভাব সৃষ্টির কথা প্রথম জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
২০২০ সালের শুরুতেই চীনের উহান শহর থেকে শুরু হয় নতুন ধরনের অজ্ঞাত এই প্রাণঘাতি ‘নোভেল করোনাভাইরাস’ এর প্রাদুর্ভাব। অজ্ঞাত এই ভাইরাস সম্পর্কে শুরুতে কোনও প্রকার তথ্য না জানা থাকলেও পরবর্তীতে এর প্রতিষেধক টীকা উদ্ভাবন সম্ভব হয়।
মহামারি রূপ ধারণ করা এই ভাইরাসটি উৎপত্তিস্থল চীন ছাড়াও বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিশ্বজুড়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭০ কোটি ৪৭ লাখ ৫৩ হাজার অতিক্রম করে। মৃতের সংখ্যা দাড়ায় ৭০ লাখ ১০ হাজার জনে। যাদের মধ্যে আমেরিকা, ব্রাজিল, ভারত ও রাশিয়ার নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে। লকডাউনে থেমে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব। বর্তমান প্রজন্ম দেখেছিল সর্বশেষ মহামারী। আবারো হয়তো ১০০ বছর পর নতুন কোন অজানা মহামারীর কালো থাবায় নিঃশেষ হয়ে যাবে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব। পৃথিবী থেকে মুছে যাবে আমাদের অস্তিত্ব ঠিক যেভাবে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে বিলুপ্ত হয়েছিল ডাইনোসরের মত বিশালদেহী প্রানী।
ক্যাটাগরিঃ

