*** ভিডিওটি ইউটিউবে দেখতে এই পোষ্টের নিচে যান ***
আজকের ব্লগে আপনি জানতে চলেছেন মানব সৃষ্ট এক ভয়ানক দানব সম্পর্কে, বিজ্ঞানীদের ভাষায় থার্মোনিউক্লিয়ার ওয়েপন। নামটা শুনতে সহজ সরল মনে হলেও, এর চেয়ে ভয়াবহ অস্ত্র পৃথিবীতে আর সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। জি আমি হাইড্রোজেন বোমার কথাই বলছি।
আপনি এর নাম শুনে থাকলেও এর ভয়াবহ ধ্বংসলীলা সম্পর্কে হয়তো অবগত নন।
এডওয়ার্ড টেলার, যিনি এই বোমার জনক হিসেবে পরিচিত, তিনি ছিলেন একজন হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং রাসায়নিক প্রকৌশলী। বলা বাহুল্য তিনি একজন ইহুদী। তিনি প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরীর ক্ষেত্রেও অবদান রাখেন এবং পরবর্তীতে হাইড্রোজেন বোমা বা থার্মোনিউক্লিয়ার বোমার নীল নকশা তৈরি করেন।
এটার ক্ষমতা সম্পর্কে আপনাকে সামান্য একটু ধারনা দেব এখন।
চলুন ফিরে যাওয়া যাক ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে।
দিনটি ছিল ৬ আগস্ট ১৯৪৫, জাপানের একটি রদ্রউজ্জল দিন। এই দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা শহরে "লিটল বয়" নামের একটি অ্যাটম বোমা ফেলেছি যার বিস্ফোরণে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হয়েছিল। এর ঠিক তিন দিন পর নাগাসাকিতে "ফ্যাট ম্যান" নামের আরেকটি বোমা ফেলা হয়, যাতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়।
৮০ বছর অতিক্রম করার পরেও জাপানের এই অঞ্চল দুটিতে এখনও অধিকাংশ শিশু জন্ম নেয় বিকলাঙ্গ হয়ে। এই দুইটি বোমা হামলা ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র ব্যবহার, যা বিশ্বে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
আর এর পরেই জাপানের সম্রাট হিরোহিতো ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ঘোষণা করেন। এরপর ২রা সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫ সালে টোকিও উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস মিসৌরি-তে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করা হয়। আর এর মধ্যদিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং আমেরিকা একটি পারমানবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসাবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করে।
শুধুমাত্র একটি অ্যাটম বোমার কাছে আমরা মানব জাতি কতোটা অসহায় ভেবে দেখেছেন?
অথচ বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি হাইড্রোজেন বোমার কাছে একটি অ্যাটম বোমা নেহাত সদ্য জন্ম নেয়া নিরীহ শিশু। হাইড্রোজেন বোমা বা থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা হলো মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরক অস্ত্রগুলোর একটি কিন্তু সাইজে ও ওজনে একটি অ্যাটম বোমার থেকে অনেক ছোট এবং হালকা। এটি নিউক্লিয়ার অস্ত্রের দ্বিতীয় প্রজন্ম, যা অ্যাটম বোমার চেয়েও হাজার গুণ বেশি বিধ্বংসী। এবার তাহলে ভাবুন কতোটা ভয়ানক এই হাইড্রোজেন বোমা। আকারে ছোট ও হালকা হওয়ার ফলে এটাকে যেকোনো ছোট মিসাইলের ওয়্যারহেডে খুব সহজেই স্থাপন করা যায়। এমনকি এটিকে নিক্ষেপ করার জন্য আলাদা কোন যুদ্ধ বিমান বা বমারু বিমানের প্রয়োজন নেই একেবারেই।
যাকে ঘিরে আমাদের সৌরজগৎ সেই সূর্যের মতোই কাজ এই বোমার। সূর্যে হাইড্রোজেন পুড়ে যে তাপ তৈরি হয় তা অনেক সময় আমরা পৃথিবী থেকেও সহ্য করতে পারি না। সূর্যের অভ্যান্তরে হাইড্রোজেন পুড়ে হিলিয়ামে রুপান্তরিত হয়ে যে তাপ নির্গত হয় তার পুরো প্রসেস সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর। এখান থেকে যে তাপ তৈরি হয় তা প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশে পাশে। আর একটি হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ হলে তা থেকে তাপ নির্গত হবে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সেটা মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই। যা সূর্যকেও হার মানায়।
জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে দুইটি অ্যাটম বোম ফেলা হয়েছিল তা থেকে শক্তি নির্গত হয়েছিল যথাক্রমে ১৫ ও ২১ কিলোটন TNT। অথচ একটি হাইড্রোজেন বোমা থেকে শক্তি নির্গত হয় ১ থেকে ৩ হাজার গুন বেশি।
পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র হাইড্রোজেন বোমার গল্প শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, যখন বিশ্বের পরাশক্তিগুলো তাদের প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। এই গল্পের দুটি মূল অধ্যায় হলো যুক্তরাষ্ট্রের আইভি মাইক এবং রাশিয়ার জার বোম্বা, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ভয়াবহ অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত। এই বোমাগুলোর বিস্ফোরণ শুধু ভৌগোলিক সীমানাই পাল্টে দেয়নি, বরং বিশ্ব রাজনীতি ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমোঘ ছাপ রেখেছে।
আইভি মাইক: প্রথম হাইড্রোজেন বোমার জন্ম
১৯৫২ সালের ১লা নভেম্বর, প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের এনিওয়েটোক অ্যাটলে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে তাদের হাইড্রোজেন বোমা, যার কোডনাম ছিল আইভি মাইক। এই বোমার শক্তি ছিল ১০.৪ মেগাটন—যা হিরোশিমায় নিক্ষেপিত অ্যাটম বোমার (১৫ কিলোটন) তুলনায় প্রায় ৭০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে এটি একটি সম্পূর্ণ দ্বীপকে বাষ্পীভূত করে দেয় এবং মাটিতে সৃষ্টি করে এক মাইলেরও বেশি প্রশস্ত একটি গর্ত। এই ঘটনা বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় যে, হাইড্রোজেন বোমা কেবল অস্ত্র নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মানুষের লড়াইয়ের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন।
আইভি মাইক ছিল একটি বিশাল যন্ত্র, যার ওজন ছিল প্রায় ৮২ টন এবং এটি কোনো ব্যবহারিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তবে এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি মাইলফলক ছিল, যা ফিউশন প্রযুক্তির সম্ভাবনা প্রমাণ করে। এই পরীক্ষা ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
জার বোম্বা: সকল বোমার জনক
যুক্তরাষ্ট্রের এই সাফল্যের পর রাশিয়া পিছিয়ে থাকেনি। ১৯৫৩ সালে তারা তাদের প্রথম হাইড্রোজেন বোমার নকশা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে জার বোম্বা নামে পরিচিত হয়। এই বোমাকে বলা হয় “সকল বোমার জনক”। রুশ ভাষায় এটি কুজকিনা ম্যাট (Kuzkina Mat, অর্থাৎ “কুজকার মা”) নামেও পরিচিত, যা একটি জনপ্রিয় রুশ উক্তি। এই নামের পেছনে ছিল রাজনৈতিক প্রতীকীতা। ১৯৬০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে “এক হাত দেখিয়ে নেওয়ার” ঘোষণা দেন। ইংরেজিতে এটি অনুবাদিত হয় “We’ll show you” বা “আমরা দেখাবো”, যার অর্থ ছিল এমন কিছু উপহার দেওয়া, যা বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি।
১৯৬১ সালের ৩০ অক্টোবর, রাশিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে। নোভায়া জেমলিয়া দ্বীপপুঞ্জে তারা জার বোম্বার সফল পরীক্ষা চালায়, যার ক্ষমতা ছিল ৫৬ মেগাটন—পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বিস্ফোরণ। এই বোমা মূলত ১০০ মেগাটন ক্ষমতার জন্য নকশা করা হয়েছিল, কিন্তু পরিবেশগত ও কারিগরি ত্রুটির কারণে শক্তি কমিয়ে ৫৬ মেগাটনে নামানো হয়। রেডিয়েশনের ঝুঁকি কমাতে ইউরনিয়াম এর পরিবর্তে কপার লেদ বসানো হয়েছিল। তবুও এর ধ্বংসলীলা ছিল অকল্পনীয়।
বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট মাশরুম মেঘ ৫৬ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছায় এবং ১০০০ কিলোমিটার দূর থেকেও দৃশ্যমান ছিল। জাপানের হিরশিমায় নিক্ষেপ করা অ্যাটম বোম থেকে এটি ১৫০০ গুন বেশি শক্তিশালী ছিল। এই বোমার বিস্ফোরণ থেকে উৎপন্ন শক ওয়েভ পৃথিবীকে ৩ বার প্রদক্ষিন করেছিল। এর ফলে নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডে জানালার কাচ ফেটে যায়।
এই বোমা ছিল তিন স্তরবিশিষ্ট হাইড্রোজেন বোমা, যা ফিশন ও ফিউশন প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে তৈরি। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই বোমার শক্তির কোনো “সীমানা” নেই—অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে হাইড্রোজেন বোমার শক্তি অসীম পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এই বিস্ফোরণ পৃথিবীর কাছে একটি সতর্কবার্তা ছিল: মানুষ এমন শক্তি আয়ত্ত করেছে, যা সভ্যতাকে এক মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
আপনার মনে এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত যতগুলো হাইড্রোজেন বোমা রয়েছে তা দিয়ে আমাদের এই বাসযোগ্য পৃথিবীকে কতবার ধ্বংস করা যাবে?
এর উত্তরটা বাস্তবেই ভয়ানক। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আনুমানিক যতগুলো হাইড্রোজেন বোমা আমাদের পৃথিবীতে রয়েছে তা দিয়ে এই সবুজ গ্রহকে দুই বা ততোধিকবার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব।
তাহলে কতোগুলো হাইড্রোজেন বোমা রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে?
এর আসল সংখ্যা অত্যান্ত গোপনীয়। বিভিন্ন গবেষণা ও গোপন তথ্য থেকে আনুমানিক ধারনা করা যায় পৃথিবীতে ১২২০০ থেকে ১৩০০০ হাইড্রোজেন বোমা রয়েছে যার মদ্ধে ৪ হাজার বোমা যেকোনো সময় ব্যবহার যোগ্য।
একটি হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা অ্যাটম বোমা থেকে অনেক বেশি জটিল ও সময় সাপেক্ষ। বর্তমানে খুব সীমিত কয়েকটি দেশ হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করতে সক্ষম যাদের মদ্ধে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া।
এই বোমাগুলোর পরীক্ষা বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে। এর ফলে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার মদ্ধে NPT ও CTBT গুরুত্বপূর্ণ।
NPT (Non-Proliferation Treaty) – বা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি এবং CTBT (Comprehensive Nuclear-Test-Ban Treaty) বা পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তি। কিন্তু আদতে কি এই সব সামান্য কাগজে স্বাক্ষর করা চুক্তি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে? প্রশ্ন রইলো আপনাদের কাছে। ক্ষমতা আর দাপটের কাছে নিতান্তই অসহায় এই সকল চুক্তিপত্র।
আইনস্টাইন বলে গিয়েছিলেন, “কি অস্ত্র দিয়ে ৩য় বিশ্বযুদ্ধ হবে যানা নেই, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি ও পাথর দিয়ে।” কিন্তু আমার মনে হয় চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ করার জন্য এই পৃথিবীর কোন অস্তিত্বই থাকবে না, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেই সব শেষ হয়ে যাবে। থাকবনা আমরা কেউই।

