Latest

সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

বন্ধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন—তাহলে ভবিষ্যতে নভোচারীরা কোথায় থাকবেন?

২০০০ সালের ২ নভেম্বর মানব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেদিন বিল শেফার্ড, ইউরি গিডজেঙ্কো এবং সের্গেই ক্রিকালেভ নামের তিন নভোচারী প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন (আইএসএস)-এ দীর্ঘ সময় থাকার জন্য পৌঁছান। সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও এই মহাকাশ স্টেশন মানুষশূন্য ছিল না। অর্থাৎ, গত প্রায় ২৫ বছর ধরে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে সবসময়ই মানুষ বসবাস করছে।

আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন ছিল মানবজাতির অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক অর্জন। এটি কোনো একক দেশের প্রকল্প নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, কানাডা এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সিসহ মোট ১৫টি দেশের যৌথ উদ্যোগে এটি তৈরি হয়েছে। পুরো স্টেশনটি একবারে মহাকাশে পাঠানো সম্ভব ছিল না। তাই ৪২টি আলাদা মিশনের মাধ্যমে এর বিভিন্ন অংশ মহাকাশে নিয়ে গিয়ে সেখানে জোড়া লাগিয়ে সম্পূর্ণ করা হয়।

গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে ২৬টি দেশের ২৫০ জনের বেশি নভোচারী এখানে কাজ করেছেন। তারা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪১০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করে হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেছেন। এসব গবেষণার মাধ্যমে নতুন ওষুধ আবিষ্কার থেকে শুরু করে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয় পর্যন্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে।

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—পৃথিবীর এত কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও নভোচারীরা কেন ভেসে থাকেন? কারণ, আইএসএস আসলে ক্রমাগত পৃথিবীর দিকে পড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে—প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৭.৬৬ কিলোমিটার বা ঘণ্টায় প্রায় ২৭,০০০ কিলোমিটার বেগে। এই গতির কারণে এটি পৃথিবীতে পড়ে না, বরং পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে। এই অবস্থাকে বলা হয় মাইক্রোগ্র্যাভিটি, যেখানে সবকিছু ওজনহীন মনে হয়।

এটি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ নেওয়া যায়। যদি একটি পাথর সুতার সঙ্গে বেঁধে ঘোরানো হয়, তবে সেটি ঘুরতেই থাকবে যতক্ষণ না ঘোরানো বন্ধ করা হয়। ঠিক তেমনই আইএসএস তার গতির কারণে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে এবং নিচে পড়ে না।

তবে এই ঐতিহাসিক মহাকাশ স্টেশনের কার্যকাল এখন শেষের দিকে। আইএসএসের মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং ২০৩১ সালে এটি স্থায়ীভাবে অবসর নেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর এটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করিয়ে ধ্বংস করা হবে। এর ধ্বংসাবশেষ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্জন স্থানে ফেলা হবে, যার নাম ‘পয়েন্ট নেমো’। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী ও জনবসতিহীন এলাকা, তাই মানুষের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

এদিকে আইএসএস পরিচালনা নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতাও তৈরি হয়েছে। এতদিন রাশিয়ার সহায়তায় স্টেশনটির কক্ষপথ ঠিক রাখা হতো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় রাশিয়া এই সহযোগিতা বন্ধ করার হুমকি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাসা স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুল ব্যবহার করে একই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরীক্ষা চালায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইএসএস বন্ধ হয়ে গেলে কি মহাকাশে মানুষের বসবাস বন্ধ হয়ে যাবে? এর উত্তর হলো—না। ইতোমধ্যে চীনের তিয়াংগং স্পেস স্টেশন চালু হয়েছে, যেখানে নভোচারীরা অবস্থান করছেন। যদিও এটি আইএসএসের তুলনায় ছোট, তবুও এটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এছাড়া রাশিয়া নিজস্ব নতুন স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করছে এবং ভারতও ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের নিজস্ব স্পেস স্টেশন চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

অন্যদিকে নাসা এখন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা সরাসরি নতুন স্টেশন তৈরি না করে বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে স্টেশন তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও করছে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে চাঁদের কক্ষপথে একটি ‘গেটওয়ে’ স্টেশন তৈরি করা হবে এবং পরে চাঁদের মাটিতে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করা হবে। আর্টেমিস-১ মিশন ইতোমধ্যে সফল হয়েছে। আর্টেমিস-২ মিশন ২০২৬ সালে এবং আর্টেমিস-৩ মিশনের মাধ্যমে ২০২৭ সালে মানুষ আবার চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আইএসএসের অবসর মানবজাতির মহাকাশ যাত্রার শেষ নয়, বরং এটি নতুন যুগের সূচনা। ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়বে—হয় নতুন স্পেস স্টেশনে, নয়তো চাঁদের স্থায়ী ঘাঁটিতে। তাই মহাকাশে মানুষের বসবাস অব্যাহত থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।


ইউটিউবে দেখুনঃ


ক্যাটাগরিঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.