Latest

সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

দানবীয় কামান 'গুস্তাভ': দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিস্ময়কর মারণাস্ত্র

 *** ভিডিওটি ইউটিউবে দেখতে এই পোষ্টের নিচে যান ***

যুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু অস্ত্রের জন্ম হয়েছে, যা সেই সময়ের সকল ধারণাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। জার্মানদের তৈরি 'গুস্তাভ' কামান তেমনই এক বিস্ময়! ১৯৩০-এর দশকে জার্মান প্রকৌশলীদের নকশায় নির্মিত এই বিশাল কামানটি শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ট্যাঙ্কই ছিল না, বরং এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বৃহৎ কামানের শীর্ষস্থান সগৌরবে দখল করে রেখেছে। এর বিশালতা এতটাই অভাবনীয় ছিল যে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও তা রীতিমতো বিস্ময় জাগায়।

গুস্তাভের দানবীয় আকার ও ওজন

গুস্তাভ কামানের আকার ছিল কল্পনাতীত। ৩৮ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং ২৩ ফুট ৪ ইঞ্চি প্রস্থের এই কামানের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫৫ ফুট ২ ইঞ্চি। এর নলের ব্যাস ছিল ২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৯৮ ফুট। পুরো কামানটির ওজন ছিল ১৩৫০ টন, অর্থাৎ ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার কিলোগ্রাম! এই বিশাল কামানের একেকটি গোলার ওজন ছিল ৭ হাজার কিলোগ্রাম। এই দৈত্যাকার কামানটি নিজেই একটি চলন্ত দুর্গ ছিল।
প্রথম ব্যবহার এবং বিধ্বংসী ক্ষমতা

১৯৪১ সালে ফরাসি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম ব্যবহৃত হয় এই জার্মান ট্যাঙ্কটি। এর বিপুল ওজনের গোলা ৪৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রতিপক্ষ ঘাঁটিতে নিক্ষেপ করতে সক্ষম ছিল – যা সেই সময়ে ছিল অকল্পনীয়। ১৯৩৯ সালের প্রথম টেস্ট ফায়ারে 'গুস্তাভ'-এর গোলা ৩ ফুট পুরু লোহার পাতে মোড়া ২৩ ফুট চওড়া কংক্রিটের দেওয়াল গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ভাবুন একবার, কী ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতা ছিল এই কামানের!

১৯৪২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি সেবাস্তপল বাজেয়াপ্ত করার সময় 'গুস্তাভ' থেকে ৪২ বার গোলা নিক্ষেপ করা হয়। এই শহরটি দখল করতে জার্মান বাহিনীর কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল, এবং গুস্তাভের গোলাবর্ষণ সে প্রতিরোধ ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ৮০ চাকা বিশিষ্ট এই 'গুস্তাভ' ২৪ ঘণ্টায় মোট ১৪ বার গোলা ছুড়তে পারত, যদিও এর গোলা লোড করা এবং ফায়ার করার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ

গুস্তাভের ওজন এতটাই বেশি ছিল যে এটিকে সড়ক পথে পরিবহন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই দৈত্যাকার কামানটি এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যেতে বিশেষ রেলওয়ে ট্র্যাকের ব্যবহার করা হতো। এর প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে রেলে পরিবহন করা হত এবং তারপর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বিশাল ক্রেন ও কয়েক হাজার শ্রমিকের সাহায্যে এটিকে পুনরায় জোড়া লাগানো হত। এটি মূলত তৈরি করা হয়েছিল ফ্রান্সের শক্তিশালী ম্যাজিনো লাইন (Maginot Line) গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য, যা ছিল ফ্রান্সের দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পরবর্তীতে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নে মোতায়েন করা হয় অপারেশন বারবারোসার অধীনে, যেখানে এর বিধ্বংসী ক্ষমতা কাজে লাগানো হয়।

তবে, এই ব্যয়বহুল কামানের রক্ষণাবেক্ষণও ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এটিকে বিমান হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য ৪ হাজারেরও বেশি সৈন্যের একটি বিশেষ দল মোতায়েন করা হয়েছিল। এছাড়াও, মিত্রবাহিনীরা যাতে ভুল করে এগুলোকে হামলা না করে বসে, সেজন্যও বিশেষ এক সেনাবাহিনী গঠন করা হয়েছিল শুধুমাত্র এই কামানের সুরক্ষার জন্য! এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার জন্য প্রতিদিন শত শত শ্রমিক ও প্রকৌশলী কাজ করত।
গুস্তাভের শেষ পরিণতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, যখন জার্মানির পরাজয় অনিবার্য হয়ে উঠছিল, তখন জার্মানরাই এই দানবীয় কামানটি ধ্বংস করে দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত বাহিনী যাতে এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হাতে না পায়। গুস্তাভ কামানের অবশেষ পরবর্তীতে সোভিয়েতরা খুঁজে পায়, কিন্তু এর প্রযুক্তিগত রহস্য তারা পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেনি।

গুস্তাভ কামান ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক চরম প্রকৌশলগত উদাহরণ এবং যুদ্ধের উন্মাদনার এক প্রতীক। এটি প্রমাণ করে, মানবজাতি ধ্বংসের জন্য কতটা বিশাল এবং জটিল মারণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। এটি যেমন জার্মান প্রকৌশলীদের মেধার স্বাক্ষর বহন করে, তেমনই মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে।

ইউটিউবে দেখুনঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.