*** ভিডিওটি ইউটিউবে দেখতে এই পোষ্টের নিচে যান ***
আফিম যুদ্ধ: চীন ও পশ্চিমা শক্তির সংঘর্ষের ইতিহাস
১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর (বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্স) মধ্যে দুটি বড় যুদ্ধ হয়েছিল, যেগুলোকে ইতিহাসে “আফিম যুদ্ধ” নামে ডাকা হয়। প্রথম যুদ্ধ হয় ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে, আর দ্বিতীয় যুদ্ধ হয় ১৮৫৬ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে। দ্বিতীয় যুদ্ধকে কখনো কখনো “তীর যুদ্ধ” বা “অ্যাংলো-ফরাসি যুদ্ধ”ও বলা হয়।
এই যুদ্ধগুলো শুধু চীনের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন ছিল না, বরং ছিল পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে একটি আত্মনির্ভর ও গর্বিত জাতিকে জোর করে নিজেদের বাণিজ্যিক শৃঙ্খলে ফেলার চেষ্টার প্রতিফলন।
চীন ছিল বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সাম্রাজ্য
উনিশ শতকের আগে চীন ছিল বাইরের বিশ্বের থেকে আলাদা। তারা নিজের মতো করেই চলতে চাইত। বাইরের কোনো দেশের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে চাইত না। আত্মনির্ভরতা ছিল তাদের নীতির মূল কথা। তাদের সংস্কৃতি, শাসনব্যবস্থা, ও চিন্তাধারাকে তারা পৃথিবীর সেরা বলে মনে করত।
চীন সরকার বিদেশিদের সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করে দিয়েছিল। শুধু ক্যান্টন নামে একটি নির্দিষ্ট বন্দর ব্যবহার করে কিছু ইউরোপীয় বণিককে সীমিতভাবে বাণিজ্য করার অনুমতি দেওয়া হতো। তবে তারা চায়নি বিদেশিরা তাদের অভ্যন্তরীণ সমাজে প্রবেশ করুক বা প্রভাব ফেলুক।
ব্রিটেনের আগ্রহ ও বাণিজ্যিক চাপ
১৬০০ সালের দিকে ইউরোপীয় বণিকরা ধীরে ধীরে চীনের দিকে আসতে থাকে। বিশেষ করে গ্রেট ব্রিটেন, যারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে এশিয়াজুড়ে বাণিজ্য বিস্তার করছিল। তারা চীনের সঙ্গে ব্যবসা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
চীনের তৈরি পণ্য যেমন—চা, রেশম, ও পোর্সেলিন ইউরোপে দারুণ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু চীনের একক মুদ্রা ব্যবস্থার কারণে তারা শুধুমাত্র রুপার কয়েন নিতে চাইত, ইউরোপীয় পণ্য নয়। এতে ব্রিটেনের অর্থভাণ্ডার ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে।
চীনের এই একপাক্ষিক বাণিজ্যনীতি ব্রিটেনের কাছে ছিল অপমানজনক ও বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিকর। তারা চেয়েছিল সমান বাণিজ্যিক সুযোগ, কিন্তু চীন তা দিতে রাজি হয়নি।
ব্রিটেনের কৌশল: আফিম রপ্তানি ও আসক্তি ছড়ানো
১৭০০ সালের দিকে ব্রিটিশরা তাদের অধীনস্থ ভারতীয় অঞ্চলে (বিশেষ করে বাংলায়) পপি ফুলের চাষ শুরু করে। পপির ফল থেকে তৈরি হয় আফিম, যেটা একটি মারাত্মক আসক্তিকর মাদক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই আফিম বিপুল হারে উৎপাদন করে এবং চীনে পাচার করতে থাকে।
প্রথমে চীনে আফিম অবৈধ ছিল, কিন্তু গোপনে অনেক ব্যবসায়ী, এমনকি চীনা সরকারি কর্মচারীরাও এই চোরাকারবারে যুক্ত ছিল। ধীরে ধীরে চীনের সমাজে—সেনাবাহিনী, ব্যবসায়ী, কৃষক, এমনকি শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যেও আফিমের প্রতি ভয়ানক আসক্তি জন্মে।
চীনের সরকার এটা বুঝতে পারে যে আফিম শুধু সমাজকে নষ্ট করছে না, দেশের ভবিষ্যতকেও ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। তাই ১৭৯৯ সালে সরকার এক ঘোষণায় আফিম আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে।
কিন্তু ব্রিটিশরা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোপনে ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। তারা স্থানীয় দালাল নিয়োগ করে, চীনের ভিতরেই আফিম পৌঁছে দেয়। চীনের সীমান্ত, বন্দর ও নদীপথে এই মাদকের গোপন বাণিজ্য আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
চীনের পদক্ষেপ ও প্রথম আফিম যুদ্ধের সূচনা
১৮৩৯ সালের মার্চ মাসে চীনের সম্রাট একজন সাহসী ও নীতিবান কর্মকর্তা লিন জেক্সু-কে ক্যান্টনে পাঠান। তার নেতৃত্বে প্রায় ১৪০০ টন আফিম জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। এই ধ্বংসকৃত আফিমের মূল্য ছিল আনুমানিক ২.৮ মিলিয়ন পাউন্ড—যা ব্রিটিশদের কাছে ছিল বিশাল আর্থিক ক্ষতির বিষয়।
এই ঘটনার পরপরই ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এরপর একদল ব্রিটিশ নাবিক চীনে একজন নাগরিককে হত্যা করে। চীন চায় অভিযুক্তদের বিচার করতে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বলে—তাদের নাগরিকদের বিচার বিদেশি সরকার করতে পারবে না। এই অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্ক চরম অবনতি ঘটায়।
১৮৩৯ সালে ব্রিটেন যুদ্ধ ঘোষণা করে, আর শুরু হয় প্রথম আফিম যুদ্ধ।
প্রথম আফিম যুদ্ধ (১৮৩৯–১৮৪২)
ব্রিটিশ নৌবাহিনী চীনের পার্ল নদীর মুখে চীনা প্রতিরোধ ভেঙে ফেলে। এরপর তারা হংকংয়ে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ১৮৪১ সালে ক্যান্টন শহর দখল করে নেয়। একের পর এক শহর ব্রিটিশদের হাতে চলে যেতে থাকে।
১৮৪২ সালে তারা নানকিং শহর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। চীন বুঝতে পারে, তারা ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্র আর প্রশিক্ষিত বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে জিততে পারবে না।
এই অবস্থায় চীন বাধ্য হয়ে “নানকিং চুক্তি” স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে:
- হংকং দ্বীপ ব্রিটেনের হাতে তুলে দেওয়া হয়
- পাঁচটি বন্দর (যেমন সাংহাই, নিংবো) বিদেশি বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হয়
- চীনকে বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে হয়
- ব্রিটিশ নাগরিকরা চীনের আইনের বাইরে থাকার অধিকার পায়
এই চুক্তিকে চীন একটি “অসম চুক্তি” হিসেবে গণ্য করে, কারণ এতে চীনের কোনো দাবি বা শর্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ (১৮৫৬–১৮৬০): অপমানের পুনরাবৃত্তি
প্রথম যুদ্ধের পরেও ব্রিটিশরা চেয়েছিল আরও বেশি সুবিধা। এদিকে চীনও তাদের পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল। এই টানাপোড়েনের মাঝে, ১৮৫৬ সালে একটি ছোট ঘটনার মাধ্যমে আবার উত্তেজনা শুরু হয়।
চীনা কর্তৃপক্ষ “Arrow” নামে এক ব্রিটিশ পতাকাবাহী জাহাজে অভিযান চালায় এবং কিছু লোককে গ্রেপ্তার করে। ব্রিটেন এটিকে ‘জাতীয় অপমান’ বলে দাবি করে এবং আবারও যুদ্ধ শুরু করে।
একই সময়ে একজন ফরাসি মিশনারির মৃত্যুকে অজুহাত বানিয়ে ফ্রান্স-ও ব্রিটেনের পাশে দাঁড়ায়।
আরও অপমানজনক শর্ত ও সামরিক দখল
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী ক্যান্টন শহর দখল করে নেয়। এরপর তারা তিয়ানজিন চুক্তি (১৮৫৮) স্বাক্ষর করায়, যেখানে চীনকে:
- বেইজিংয়ে দূতাবাস স্থাপন করতে দিতে হয়
- আরও বন্দর খুলে দিতে হয়
- খ্রিস্টান মিশনারিদের স্বাধীনতা দিতে হয়
- আফিমকে বৈধভাবে আমদানি করার অনুমতি দিতে হয়
চুক্তি স্বাক্ষরের পরও যখন চীন বিদেশিদের বেইজিং প্রবেশে বাধা দেয়, তখন ১৮৬০ সালে যৌথ বাহিনী দাগু দুর্গ ধ্বংস করে এবং বেইজিং লুট করে।
এমনকি সম্রাটের গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদ “ইউয়ানমিং গার্ডেন” আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা ছিল চীনের সংস্কৃতির এক অপূর্ব নিদর্শন।
উপসংহার: চীনের জন্য এক শতাব্দীর অপমান
এই যুদ্ধগুলো ছিল শুধুমাত্র মাদক বা বাণিজ্য নিয়ে নয়—এগুলো ছিল চীনের আত্মমর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক আঘাত। এই দুই যুদ্ধ এবং পরবর্তী “অসম চুক্তি” গুলো চীনকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
চীনারা এই সময়কে স্মরণ করে “Century of Humiliation”—অপমানের শতাব্দী হিসেবে। আফিম যুদ্ধ ছিল সেই অপমানের এক ভয়াবহ সূচনা।

