সব যুদ্ধই নিঃসন্দেহে ভয়াবহতা ও বেদনার প্রতীক, কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধও আছে যেগুলোতে মিশে আছে খানিকটা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর অদ্ভুত হাস্যরস। এর মধ্যে সবচেয়ে অনন্য ও বিস্ময়কর হলো ১৮৯৬ সালের অ্যাংলো-জাঞ্জিবার যুদ্ধ। এই যুদ্ধই পেয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্প সময়ের যুদ্ধের খেতাব। বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু পুরো যুদ্ধটি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৩৮ মিনিট।
যুদ্ধের পটভূমি
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। আফ্রিকা মহাদেশকে নিয়ে তখনকার ইউরোপীয় শক্তিগুলো ছিল প্রবল আগ্রহী, কারণ আফ্রিকা ছিল প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাঞ্জিবার তখন পূর্ব আফ্রিকার একটি সুলতানি রাষ্ট্র, যা আজকের তানজানিয়ার অংশ। নামমাত্র স্বাধীন হলেও জাঞ্জিবার কার্যত ব্রিটিশদের প্রভাবাধীন ছিল।
১৮৯০ সালে ব্রিটিশ ও জার্মানদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যাতে পূর্ব আফ্রিকায় কে কোথায় নিয়ন্ত্রণ করবে তার সীমানা ঠিক করা হয়েছিল। এর পর থেকেই জাঞ্জিবার সরাসরি ব্রিটিশদের স্বার্থের অংশে পরিণত হয়।
সুলতানি সঙ্কট
১৮৯৬ সালে মারা যান জাঞ্জিবারের সুলতান হামাদ বিন থুয়াইনি। তিনি ছিলেন ব্রিটিশদের প্রিয়পাত্র এবং তাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের একটি চুক্তি ছিল—
-
সুলতানের মৃত্যুর পর নতুন সুলতান নির্বাচনের আগে ব্রিটিশ কনসালের অনুমতি নিতে হবে।
কিন্তু হামাদের মৃত্যুর পর অঘটন ঘটে। ব্রিটিশদের পছন্দ করা প্রার্থী সুলতান হওয়ার আগেই খালিদ বিন বারঘাশ রাজপ্রাসাদ দখল করে নিজেকে সুলতান ঘোষণা করেন।
ব্রিটিশদের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশরা খালিদকে সতর্ক করেছিল যে তার এই সুলতানি ব্রিটিশদের অনুমোদন পাবে না। কিন্তু খালিদ তাতে কর্ণপাত করেননি। তিনি প্রাসাদে প্রায় ৩,০০০ সৈন্য, কামান এবং প্রাসাদের প্রাচীরে সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
অন্যদিকে, ব্রিটিশরা সময় নষ্ট না করে তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো জাঞ্জিবারের উপকূলে এনে মোতায়েন করে। ব্রিটিশ কনসাল খালিদকে আল্টিমেটাম দেয়—
সকাল ৯টার মধ্যে প্রাসাদ ছেড়ে দিতে হবে, নাহলে যুদ্ধ শুরু হবে।
যুদ্ধের সূচনা ও সমাপ্তি
২৭ আগস্ট ১৮৯৬ সালের সকাল ৯টা বাজতেই ব্রিটিশ নৌবহর থেকে গোলাবর্ষণ শুরু হয়। প্রাসাদের দেয়াল মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে, কামান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। জাঞ্জিবারের সৈন্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে থাকে।
মাত্র ৩৮ মিনিটের মধ্যে পুরো যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। খালিদ প্রাসাদ ছেড়ে জার্মান কনস্যুলেটে পালিয়ে আশ্রয় নেন। পরে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
যুদ্ধের ফলাফল
-
সুলতান খালিদকে সরিয়ে ব্রিটিশদের অনুমোদিত প্রার্থী হামৌদ বিন মোহাম্মদকে নতুন সুলতান করা হয়।
-
জাঞ্জিবার কার্যত পুরোপুরি ব্রিটিশদের ক্রীড়নক হয়ে পড়ে।
-
প্রায় ৫০০ জাঞ্জিবারি সৈন্য নিহত বা আহত হয়, অন্যদিকে ব্রিটিশ পক্ষের ক্ষতি ছিল মাত্র একজন নাবিক।
ইতিহাসে গুরুত্ব
অ্যাংলো-জাঞ্জিবার যুদ্ধ শুধু ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম যুদ্ধ হিসেবেই নয়, বরং উপনিবেশবাদের নির্মম বাস্তবতারও প্রতীক। ব্রিটিশরা দেখিয়ে দিয়েছিল, তারা কেবল কূটনৈতিক চুক্তি নয়, প্রয়োজনে কয়েক মিনিটেই একটি দেশের ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম।
এই ঘটনাটিকে অনেকে যুদ্ধের ইতিহাসের "বেমানান নাটক" বলে উল্লেখ করে থাকেন। কারণ যেখানে অন্য যুদ্ধগুলো দীর্ঘ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছে, সেখানে জাঞ্জিবার যুদ্ধ হাস্যকরভাবে আধ ঘণ্টাও টেকেনি।

