Latest

সর্বশেষ
লোড হচ্ছে...

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ভূখণ্ড, যা বিশ্বের প্রথম জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃত। ১৮৭২ সালের ১লা মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস. গ্রান্ট কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই পার্কটি মূলত ওয়াইয়োমিং রাজ্যে অবস্থিত হলেও এর বিস্তৃতি মন্টানা এবং আইডাহো পর্যন্ত প্রসারিত। প্রায় ৩,৪৭২ বর্গমাইল (৮,৯৮৩ বর্গ কিলোমিটার) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানটি তার অপরূপ সৌন্দর্য, বিচিত্র বন্যপ্রাণী, এবং সক্রিয় ভূতাপীয় বৈশিষ্ট্যাবলীর জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।

ইতিহাস ও নামকরণ

ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের আগমনের বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলটি আমেরিকার আদিবাসীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এখানে প্রায় ১১,০০০ বছর ধরে মানব বসবাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। টুকুদিকা বা ‘শিপইটার্স’-এর মতো আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করত এবং ক্র, ব্ল্যাকফিট, শোশোন ও নেজ পার্স-এর মতো উপজাতিরা ঋতুভিত্তিক শিকার এবং সম্পদ সংগ্রহের জন্য এখানে আসত।

পার্কের নামটি এসেছে ইয়েলোস্টোন নদী থেকে, যার তীরে থাকা হলুদ রঙের পাথর থেকে এই নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অভিযাত্রী এবং গবেষকদের মাধ্যমে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের কথা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, যা পরবর্তীতে এটিকে একটি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণার পথ প্রশস্ত করে।

ভূতাত্ত্বিক গঠন ও উষ্ণ প্রস্রবণ

ইয়েলোস্টোন পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের উপর অবস্থিত। এটি "ইয়েলোস্টোন ক্যালডেরা" নামে পরিচিত এক বিশাল সুপারভলকানোর উপর বসে আছে। এই ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার ফলেই পার্ক জুড়ে ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি উষ্ণ প্রস্রবণ এবং গিজার (Geyser)। এখানে প্রায় ১০,০০০-এর বেশি ভূতাপীয় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

বিখ্যাত ভূতাপীয় আকর্ষণ:

  • ওল্ড ফেইথফুল (Old Faithful): এটি পার্কের সবচেয়ে বিখ্যাত গিজার। এর নামকরণ হয়েছে এর নিয়মিত ও ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য অগ্ন্যুৎপাতের জন্য। প্রতি ৯০ মিনিটে একবার এটি গরম জলের ফোয়ারা প্রায় ১৮০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ছুড়ে দেয়।

  • গ্র্যান্ড প্রিজম্যাটিক স্প্রিং (Grand Prismatic Spring): এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম উষ্ণ প্রস্রবণ। এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো জলের উজ্জ্বল ও বিচিত্র রঙ, যা খনিজ সমৃদ্ধ জলে বসবাসকারী বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের কারণে তৈরি হয়।

  • স্টিমবোট গিজার (Steamboat Geyser): এটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ও সক্রিয় গিজার, যা ৩০০ ফুট পর্যন্ত জল নিক্ষেপ করতে পারে। তবে এর অগ্ন্যুৎপাত নিয়মিত নয়।

  • ম্যামথ হট স্প্রিংস (Mammoth Hot Springs): এটি উষ্ণ প্রস্রবণের এক জটিল ব্যবস্থা, যেখানে গরম জল ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমা করে ট্র্যাভারটাইন নামক এক প্রকার পাথরের ধাপ তৈরি করেছে, যা দেখতে অনেকটা উল্টানো ঝর্ণার মতো।

বিচিত্র বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র

ইয়েলোস্টোন বৃহত্তর ইয়েলোস্টোন ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু, যা উত্তর আমেরিকার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের প্রায় অক্ষত থাকা বৃহত্তম বাস্তুতন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। পার্কটি বিভিন্ন ধরণের বন্যপ্রাণীর এক বিশাল অভয়ারণ্য।

উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী:

  • আমেরিকান বাইসন: ইয়েলোস্টোনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো এবং বৃহত্তম বাইসনের পাল অবাধে বিচরণ করে।

  • গ্রিজলি ভাল্লুক (Grizzly Bear): এই বিশাল স্তন্যপায়ী প্রাণী পার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এবং সংরক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

  • ধূসর নেকড়ে (Gray Wolf): ১৯৯৫ সালে এখানে নেকড়ে পুনঃপ্রবর্তনের পর থেকে পার্কের বাস্তুতন্ত্রে এক ইতিবাচক ভারসাম্য ফিরে এসেছে।

  • অন্যান্য প্রাণী: এছাড়াও এখানে এল্ক (এক প্রকার হরিণ), মুস, প্রংহর্ন, বিগহর্ন শিপ, পাহাড়ি সিংহ এবং শত শত প্রজাতির পাখি দেখা যায়।

পার্কের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে সাবআলপাইন বন, তৃণভূমি এবং নদী-হ্রদের মতো বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র, যা এই প্রাণীগুলোকে বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ দিয়েছে।

পর্যটকদের জন্য আকর্ষণ ও করণীয়

প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক ইয়েলোস্টোনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। ঋতুভেদে পার্কের রূপ বদলায় এবং পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রধান আকর্ষণ ও কার্যকলাপ:

  • ইয়েলোস্টোনের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন: ইয়েলোস্টোন নদী দ্বারা সৃষ্ট এই ক্যানিয়নটি তার রঙিন পাথরের দেয়াল এবং আপার ও লোয়ার জলপ্রপাতের জন্য বিখ্যাত।

  • ইয়েলোস্টোন লেক: এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম উচ্চ-উচ্চতার হ্রদ। এখানে বোটিং, মাছ ধরা এবং কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

  • হাইকিং ও ক্যাম্পিং: পার্ক জুড়ে শত শত মাইল হাইকিং ট্রেইল রয়েছে যা দর্শনার্থীদের প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

  • বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ: লামার ভ্যালি এবং হেইডেন ভ্যালি বন্যপ্রাণী দেখার জন্য পার্কের সেরা জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম।

  • শীতকালীন কার্যকলাপ: শীতকালে পার্কটি বরফের চাদরে ঢেকে যায় এবং তখন স্নোমোবিলিং, ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং এবং স্নোশুয়িংয়ের মতো কার্যকলাপ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত গবেষণার এক জীবন্ত পরীক্ষাগার। এর ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এটিকে পৃথিবীর এক অনন্য ও অপরিহার্য অংশে পরিণত করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.